শিশুর হাতে অল্প বয়সেই স্মার্টফোন তুলে দেওয়া নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারে ঘুম, মনোযোগ, আচরণ ও মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। শিশুর সুস্থ বিকাশে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
অল্প বয়সেই স্মার্টফোনের প্রতি আসক্তি, বাড়ছে উদ্বেগ
বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের একটি পরিচিত অংশ হয়ে উঠেছে। কার্টুন দেখা, গেম খেলা, ভিডিও দেখা কিংবা অনলাইনে বিভিন্ন কনটেন্ট উপভোগ করার জন্য অনেক শিশুই দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। কখনো কখনো শিশুকে শান্ত রাখতে বা খাওয়ানোর সময় অভিভাবকেরাই তার হাতে স্মার্টফোন তুলে দেন।
কিন্তু অল্প বয়স থেকেই দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন ব্যবহারের অভ্যাস শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য কতটা উপযোগী, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মানসিক স্বাস্থ্যে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?
শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি, আচরণগত পরিবর্তন এবং মানসিক সুস্থতার বিভিন্ন সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বিনোদনমূলক ভিডিও দেখা বা গেম খেলার কারণে শিশুদের শারীরিক খেলাধুলা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং পর্যাপ্ত ঘুমের সময় কমে যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের শারীরিক সক্রিয়তা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্ক্রিন ব্যবহারের ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটি দুই বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রিন টাইম দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার মধ্যে সীমিত রাখতে এবং তিন থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও দিনে এক ঘণ্টার বেশি না দিতে পরামর্শ দিয়েছে। সময় যত কম রাখা যায়, তত ভালো। �
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নয়, শিশুরা কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, কীভাবে ডিভাইস ব্যবহার করছে এবং তাদের পারিবারিক পরিবেশ কেমন—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
গবেষণায় কী উঠে এসেছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় অঞ্চলের ২০২৫ সালের একটি নীতিগত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল পরিবেশ শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতার ওপর ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের প্রভাবই ফেলতে পারে। অনলাইন হয়রানি, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং অতিরিক্ত ব্যবহারের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, শিশু-কিশোরদের স্ক্রিন ব্যবহারের ওপর বিভিন্ন গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে কাটানোর সঙ্গে বিষণ্নতার লক্ষণ, জীবনমানের অবনতি এবং কিছু আচরণগত সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অর্থাৎ, স্মার্টফোন ব্যবহার করলেই শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বরং অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং এর ফলে শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় কী পরিবর্তন আসছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
অভিভাবকদের করণীয়
শিশুদের স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
১. নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ: শিশুর বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের সময় সীমিত রাখতে হবে।
২. ঘুমের আগে মোবাইল বন্ধ: ঘুমের সময় ঠিক রাখা এবং শোয়ার আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
৩. খেলাধুলায় উৎসাহ দেওয়া: শিশুদের বাইরে খেলাধুলা, বই পড়া, ছবি আঁকা এবং সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করতে হবে।
৪. কনটেন্ট পর্যবেক্ষণ: শিশু অনলাইনে কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কোন ধরনের গেম খেলছে, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
৫. পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো: শিশুর সঙ্গে কথা বলা, গল্প শোনানো এবং একসঙ্গে সময় কাটানোর মাধ্যমে তার মানসিক বিকাশে সহায়তা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুদের জন্য প্রযুক্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে বয়স উপযোগী, নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সচেতনতাই পারে ঝুঁকি কমাতে
স্মার্টফোন আধুনিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষা, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তিতে এর ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে শিশুদের হাতে অল্প বয়সে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যবহারের সুযোগ করে দিলে তাদের ঘুম, খেলাধুলা, সামাজিক যোগাযোগ ও মানসিক সুস্থতা উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই শিশুকে ব্যস্ত রাখার সহজ উপায় হিসেবে স্মার্টফোনের ওপর নির্ভর না করে তার সঙ্গে সময় কাটানো, খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা এবং নিরাপদ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলার দিকে অভিভাবকদের মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য শুধু আধুনিক প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুম, খেলাধুলা, পারিবারিক ভালোবাসা ও বাস্তব জীবনে মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ।
প্রতিবেদন: শাহরিয়ার শান্ত
ফার্স্টপোস্ট.অনলাইন