ফ্লোরিডা থেকে মহাকাশে রকেট উৎক্ষেপণের পর আকাশে দেখা গেল জেলিফিশের মতো উজ্জ্বল দৃশ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলো ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। তবে এটি কোনো রহস্যময় প্রাণী নয়, বরং সূর্যের আলো ও রকেটের নির্গত গ্যাসের সম্মিলিত প্রভাব।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ফাস্টপোষ্ট.অনলাইন
আকাশজুড়ে জেলিফিশের মতো বিশাল, রঙিন ও আলোকিত এক আকৃতি। কোথাও নীলাভ আলো, কোথাও সোনালি আভা, আবার কোথাও লালচে ধোঁয়ার মতো অংশ। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, যেন মহাকাশ থেকে নেমে এসেছে কোনো অজানা বস্তু। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় এমনই একটি দৃশ্যের ছবি প্রকাশ করে। ছবিগুলোতে রকেট উৎক্ষেপণের পর আকাশে তৈরি হওয়া জেলিফিশের মতো আলোকিত আকৃতি দেখা যায়। নাসা এই দৃশ্যকে ‘স্পেস জেলিফিশ’ (Space Jellyfish) হিসেবে বর্ণনা করেছে। �
যেভাবে তৈরি হলো আকাশের এই বিস্ময়কর দৃশ্য
নাসার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল স্পেস ফোর্স স্টেশন থেকে স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়। রকেটটি নাসার জন্য আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতে যাত্রা করে।
এই অভিযানের নাম ছিল SpaceX CRS-35। রকেটটি উৎক্ষেপণের সময় ছিল স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৩৩ মিনিট, সূর্যোদয়ের ঠিক আগে। তখন ভূপৃষ্ঠের আকাশে অন্ধকার থাকলেও বায়ুমণ্ডলের অনেক উঁচুতে রকেটের নির্গত গ্যাস ও জলীয়বাষ্প সূর্যের আলোয় আলোকিত হচ্ছিল। ফলে তৈরি হয় জেলিফিশের মতো অদ্ভুত ও উজ্জ্বল দৃশ্য। �
NASA +1
কেন জেলিফিশের মতো দেখায়?
রকেট যখন বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে উপরের দিকে এগিয়ে যায়, তখন এর ইঞ্জিন থেকে নির্গত গ্যাস ও জলীয়বাষ্প চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। উচ্চ বায়ুমণ্ডলের অত্যন্ত ঠান্ডা পরিবেশে এই নির্গত পদার্থের কিছু অংশ বরফের ক্ষুদ্র কণা তৈরি করতে পারে।
সূর্যোদয়ের আগে বা সূর্যাস্তের পর নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সূর্যের আলো এসব বিস্তৃত গ্যাস ও কণার ওপর পড়ে। অন্ধকার আকাশের বিপরীতে আলোকিত অংশগুলো তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রকেটের পেছনে ছড়িয়ে পড়া গ্যাসের আকৃতি দেখতে অনেকটা জেলিফিশের মাথা ও শুঁড়ের মতো লাগে।
এ ধরনের দৃশ্য সাধারণত সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের কাছাকাছি সময়ে বেশি চোখে পড়ে। এর জন্য বিশেষ কোনো রহস্যময় শক্তির প্রয়োজন নেই; মূল বিষয় হলো রকেটের নির্গত পদার্থ, উচ্চতা এবং সূর্যের আলোর অবস্থান। �
NASA Science +1
মহাকাশে কী নিয়ে যাচ্ছিল রকেটটি?
CRS-35 অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে গবেষণার সরঞ্জাম, সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পৌঁছে দেওয়া। নাসার তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে ৬ হাজার ৩০০ পাউন্ডের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৮৬০ কেজি মালামাল বহন করা হয়।
এর মধ্যে ছিল বৈজ্ঞানিক গবেষণার সরঞ্জাম এবং মহাকাশ স্টেশনের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় রোল-আউট সোলার অ্যারের শেষ জোড়াটি। অভিযানের মাধ্যমে মহাকাশে চলমান বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমে সহায়তা করার লক্ষ্য ছিল। �
এটি কি এলিয়েন বা অজানা কোনো মহাজাগতিক বস্তু?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অস্বাভাবিক দৃশ্য ছড়িয়ে পড়লে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কেউ একে মহাকাশের অজানা বস্তু হিসেবে কল্পনা করতে পারেন। কিন্তু নাসার প্রকাশিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই বিশেষ দৃশ্যটি রকেটের নির্গত গ্যাস ও সূর্যের আলোর কারণে তৈরি হয়েছে।
তাই ছবিতে জেলিফিশের মতো আকৃতি দেখা গেলেও এটি কোনো সত্যিকারের জেলিফিশ নয়। একইভাবে, এই দৃশ্যকে এলিয়েন বা ভিনগ্রহের প্রাণীর উপস্থিতির প্রমাণ বলারও কোনো ভিত্তি নেই।
বিজ্ঞান যে দৃশ্যকে করে তোলে বিস্ময়কর
মহাকাশ নিয়ে মানুষের কৌতূহল বহু পুরোনো। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এখন রকেট উৎক্ষেপণ শুধু মহাকাশ গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয়, কখনো কখনো তা পৃথিবীর আকাশেও তৈরি করে অসাধারণ দৃশ্য।
‘স্পেস জেলিফিশ’ তারই একটি উদাহরণ। সঠিক সময়ে রকেট উৎক্ষেপণ, উচ্চ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া গ্যাস এবং সূর্যের আলোর বিশেষ অবস্থানের কারণে তৈরি হওয়া এই দৃশ্য আবারও দেখিয়েছে, বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় প্রকৃতির অনেক বিস্ময়কর ঘটনার রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব।

প্রতিবেদক: শাহারিয়ার শান্ত
ফাস্টপোষ্ট.অনলাইন